সমুদ্র থেকে আহরিত চিংড়ি ও মাছ আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে অনবোর্ড বা জাহাজেই ব্লক ফ্রোজেন পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করে সরাসরি ইউরোপের বাজারে রফতানি শুরু করেছে বাংলাদেশ। এজন্য সম্প্রতি চট্টগ্রামের পাঁচটি জাহাজকে অনুমোদন দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এর অংশ হিসেবে গত ১৮ অক্টোবর দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রায় সাড়ে আট টন চিংড়ি ‘এফভি যৌথ উদ্যম’ নামের জাহাজে প্রক্রিয়াজাত শেষে হিমায়িত করে বেলজিয়ামে পাঠিয়েছে র্যাংকন সি ফিশিং লিমিটেড। এ চালানের বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ডলার।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রফতানিতে একসময় বাংলাদেশের নামডাক থাকলেও আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ ও দেশের মৎস্য খাতে বিভিন্ন জটিলতার কারণে এক দশক ধরে তা কমতে শুরু করে। ফলে কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে পিছিয়ে পড়ে বাজার হারাতে থাকেন রফতানিকারকরা। তবে সম্প্রতি ইউরোপের বাজারে সরাসরি হিমায়িত চিংড়ি রফতানির সুযোগ এ খাতে নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছে।
চট্টগ্রাম মৎস্য অধিদপ্তরের আওতাধীন মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের তথ্যমতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর বাজারে সরাসরি মাছ রফতানির জন্য বাংলাদেশের নয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ আবেদন করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাইসহ সব প্রক্রিয়া শেষে প্রথম দফায় পাঁচটি জাহাজকে অনুমোদন দেয়া হয়। এগুলো হলো এফভি সি স্টার, এফটি ডিপ সি ১ ও ডিপ সি ২, এফভি যৌথ উদ্যম এবং এফভি এসআরএল ৩। অনুমোদন প্রাপ্তির পরপরই র্যাংকন গ্রুপের ‘এফভি যৌথ উদ্যম’ নামের জাহাজে আহরিত চিংড়ি বেলজিয়ামের উদ্দেশে পাঠানো হয়।
জানা গেছে, অনবোর্ড ব্লক ফ্রোজেন প্রক্রিয়ায় প্রথমে সমুদ্র থেকে চিংড়ি আহরণের পর সেগুলোর মাথা ফেলে ও খোসা ছাড়িয়ে বরফ দিয়ে প্যাকেটজাত করা হয়। এ জন্য বিভিন্ন প্রজাতি অনুযায়ী আলাদা করা হয়। এরপর আকার অনুসারে গ্রেডিং করার পর মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এ সময় কোনো ধরনের ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেলে সেগুলোকে বাদ দেয়া হয়। এরপর বাছাইকৃত চিংড়ি কোয়ালিটি কন্ট্রোল টেবিলে মেটাল স্ক্যানার ও লাক্স মিটার দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। মান যাচাইয়ের সবগুলো ধাপ শেষে উৎকৃষ্ট চিংড়িগুলোকে ৮০০ গ্রাম ওজনের আইস ব্লক বানিয়ে -১৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ফ্রিজারে সংরক্ষণ করা হয়। পরে সমুদ্র থেকে জাহাজ সমতলে ফিরে এলে কোল্ডস্টোরেজে আবারো -১৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় রাখা হয়। পরে ব্লকগুলোকে প্রথমে ছোট ছোট প্যাকেটে ঢুকিয়ে মাস্টার প্যাকেটে সংরক্ষণ করা হয়। সবশেষে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী কনটেইনারে করে সমুদ্রপথে রফতানি করা হয়।
র্যাংকন সি ফিশিং লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর শাহরিয়ার রিমন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এফভি উদ্যম জাহাজে আহরিত টাইগার চিংড়ি প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ বেলজিয়ামে রফতানি করেছি। এর আগে এশিয়ার দেশগুলোয় এভাবে পাঠানো হতো।’ তবে এশিয়ার তুলনায় ইউরোপের বাজারে বেশি দাম পাওয়া যায় বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রামের মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফারহানা লাভলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের অর্ধশতাধিক জাহাজের মাধ্যমে আহরিত ব্লক ফ্রোজেন চিংড়ি ও মাছ জাপানে রফতানি করা হয়। তবে এশিয়ার বাজারে এর দাম তুলনামূলক কম। এ কারণে প্রথমবারের মতো ইউরোপের বাজারে রফতানির জন্য পাঁচটি জাহাজকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। আরো দুটি জাহাজের অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এসব জাহাজে আহরিত মাছ বা চিংড়ি ইউরোপীয় মান অনুযায়ী প্রক্রিয়াজাত করে সরাসরি ইউরোপের বাজারে রফতানি করা যাবে।’
সম্প্রতি ইউরোপে রফতানির অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠান ডিপ সি ফিশারিজ লিমিটেডের পরিচালক শওকত আলী চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগে চিংড়ি বা সাদা মাছ জাপান, চায়না, থাইল্যান্ড কিংবা কোরিয়ার মতো দেশে রফতানি হতো। সম্প্রতি এসব জাহাজে আরো বিনিয়োগ করে আধুনিকায়নের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে মাছ রফতানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’
এশিয়ার তুলনায় ইউরোপের বাজার অনেক বড় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগে যদি বছরে ৩০ লাখ মিলিয়ন ডলারের মাছ রফতানি করতাম, এখন সেই একই মাছ ইউরোপের বাজারে ৫০ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করা যাবে। এজন্য আমরা এখন ক্রেতার সন্ধান করছি। এমনকি বিভিন্ন দেশের ক্রেতাভেদে দাম সংগ্রহ করা হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপের বাজারে সরাসরি চিংড়ি বা মাছ রফতানির জন্য বিভিন্ন নিয়মকানুন মানতে হয়। কিন্তু অনেক সময় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন রকম কারসাজির আশ্রয় নেয়। ফলে রফতানি আদেশ বাতিলের মতো ঘটনাও ঘটে। এক্ষেত্রে অনবোর্ড ব্লক ফ্রোজেন পদ্ধতির মাধ্যমে ইউরোপের ক্রেতাদের সহজে আকৃষ্ট করা যায়।